আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক:
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে ফিলিস্তিনের গাজা এবং লেবাননে একযোগে সামরিক অভিযান ও আগ্রাসন ব্যাপকভাবে জোরদার করেছে ইসরায়েল। গাজায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতির আবহের মাঝেই বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যার ফলে গত কয়েকদিনেই ৯ শতাধিক ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে, বিগত ২৫ বছরের মধ্যে লেবাননের সবচেয়ে গভীরে প্রবেশ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)।
গাজার ৭০ শতাংশ ভূমি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা নেতানিয়াহুর
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বর্বর হামলায় এ পর্যন্ত ৭২,৯০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যেও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৬ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান।
নিউজ এর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক ইউটিউব চ্যানেল আল জাজিরা ইংলিশ ইউটিউব চ্যানেল থেকে অথেন্টিক আন্তর্জাতিক নিউজ পেতে নিয়মিত আমাদের এই নিউজ এর সাইটের সাথে থাকুন
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক নতুন এবং বিতর্কিত নির্দেশ জারি করেছেন। তিনি সামরিক বাহিনীকে গাজার স্থলভাগের নিয়ন্ত্রণ ৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার আদেশ দিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের মতে, নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা মূলত গাজায় দীর্ঘমেয়াদি ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি এবং এই ভূখণ্ডকে স্থায়ীভাবে দখল করার একটি রাজনৈতিক নীলনকশা। তথাকথিত সুরক্ষার অজুহাতে গাজার আল-শাতি শরণার্থী শিবিরসহ বিভিন্ন আবাসিক ভবন, অস্থায়ী তাঁবু এবং বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
২৫ বছরের মধ্যে লেবাননের সবচেয়ে গভীরে ইসরায়েলি সেনা
গাজার পাশাপাশি লেবানন সীমান্তেও যুদ্ধ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের স্থল সেনারা লিতানি নদী অতিক্রম করে লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চলের একটি অত্যন্ত কৌশলগত পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বিগত ২৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে লেবাননের ভূখণ্ডে এটিই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় এবং গভীরতম অনুপ্রবেশ।
এই পাহাড়ের চূড়াতেই অবস্থিত ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গ (Chateau Beaufort)। এই কৌশলগত উচ্চতা দখল করে ইসরায়েলি বাহিনী নাবাতিহ (Nabatieh) শহরকে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ বা ঘেরাও করার চেষ্টা করছে। এছাড়া দেবিন এবং আবলাত শহরের দিকেও ভারী বোমাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালানো হচ্ছে।
লেবাননে তীব্র মানবিক সংকট ও গণ-উচ্ছেদ
ইসরায়েল পুরো দক্ষিণ লেবাননকে একটি যুদ্ধক্ষেত্র বা কনফ্লিক্ট জোন হিসেবে ঘোষণা করেছে। নাবাতিহ এবং টায়ার (Tyre) শহরের সমস্ত বাসিন্দাদের অবিলম্বে জাহানি নদীর উত্তরে চলে যাওয়ার জন্য গণ-উচ্ছেদ আদেশ জারি করা হয়েছে।
এর ফলে লেবাননে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। দেশের ভেতরে ইতিমধ্যে ১০ লক্ষাধিক (১ মিলিয়নের বেশি) মানুষ বাস্তুচ্যুত বা ঘরহীন হয়ে পড়েছেন। দক্ষিণ অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা বহু মানুষ টায়ার শহরের বিভিন্ন পার্ক এবং গাড়ির ভেতরে দিনাতিপাত করছেন। আবার যারা রাজধানী বৈরুতে পৌঁছাতে পেরেছেন, তারা শহরের চারপাশে অস্থায়ী মেকশিফট তাঁবু বানিয়ে অত্যন্ত অমানবিক পরিস্থিতিতে বসবাস করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনায় অচলাবস্থা
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ (Indirect) কূটনৈতিক আলোচনা চললেও বড় ধরনের তিনটি বিষয়ে অচলাবস্থা কাটেনি। ইরানি কর্মকর্তাদের সূত্রমতে প্রধান তিনটি বাধা হলো:
- বাজেয়াপ্ত সম্পদ ফেরত (Frozen Assets): ইরান দাবি করছে, চুক্তি ঘোষণার সাথে সাথেই বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা তাদের সমস্ত আর্থিক সম্পদ অবিলম্বে নিঃশর্তভাবে ফেরত দিতে হবে। তবে আমেরিকার দাবি, এই সম্পদ একবারে নয়, বরং ইরানের শর্ত পূরণের ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে ফেরত দেওয়া হবে।
- পুনর্গঠন তহবিল (Reconstruction Fund): ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি 'পুনর্গঠন তহবিল' দাবি করেছে। এই বিশাল অংকের তহবিলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার প্রতিশ্রুতি বা সম্মতি জানায়নি।
- নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার (Sanctions Lifting): আলোচনা চলাকালীন সময়েই ইরানের তেল এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর থেকে অন্তত সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তেহরান। কিন্তু ওয়াশিংটন এই বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, এই প্রধান তিনটি বিষয়ে একটি যৌথ ঐকমত্য তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তির ঘোষণা দেওয়া সম্ভব নয়।