সুইজারল্যান্ডে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান: হরমুজ প্রণালী ও লেবানন সংকটের মাঝে ঐতিহাসিক বৈঠক শুরু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল মুহূর্তে সুইজারল্যান্ডের বুরগেনস্টক (Bürgenstock) রিসোর্টে শুরু হতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। গত সপ্তাহে ফ্রান্সে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকের (MOU) পর এটিই দুই দেশের প্রথম সরাসরি বড় কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপ। তবে এই বৈঠকের ঠিক আগ মুহূর্তে হরমুজ প্রণালী বন্ধের ইরানি ঘোষণা এবং লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন আলোচনার টেবিলকে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
বৈঠকে মূল আলোচ্য বিষয়
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance)। ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারও সম্মেলনস্থলে উপস্থিত রয়েছেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি লেবাননে স্থায়ী শান্তি ও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপ্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তারা কোনো নতুন কারিগরি আলোচনা করতে আসেনি, বরং ফ্রান্সের সমঝোতা স্মারকে আমেরিকার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ওয়াশিংটন কতটা বাস্তবায়ন করছে—তা নিশ্চিত করতেই তারা এই বৈঠকে যোগ দিচ্ছে।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও পাকিস্তান
এই ঐতিহাসিক সংলাপকে সফল করতে পর্দার আড়ালে এবং সরাসরি বড় ভূমিকা পালন করছে কাতার ও পাকিস্তান। ইতিমধ্যে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বুরগেনস্টকে অবস্থান করছেন। পাশাপাশি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এই শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্প ও ইরানের সংঘাত
লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ইরান পুনরায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' বন্ধের ঘোষণা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী (CENTCOM) দাবি করেছে, এই নৌপথটি এখনো উন্মুক্ত রয়েছে এবং তারা নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক বার্তায় ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন বা এর পরে—কোনো অবস্থাতেই ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে কোনো প্রকার শুল্ক বা টোল আদায় করতে পারবে না। ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান বৈঠকের পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।
লেবানন পরিস্থিতি ও ইসরায়েলের ভূমিকা
এই আলোচনার সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে লেবানন পরিস্থিতির ওপর। গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৪,০০০ ছাড়িয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের দাবি, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার সেনাবাহিনীকে লেবাননে অবস্থান ধরে রাখতে বললেও আক্রমণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, তবে নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত পাহাড়ি এলাকায় এখনো লড়াই চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল এই মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারককে রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখছে, যা এই শান্তি আলোচনার অন্যতম বড় বাধা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই বৈঠক যদি সফল হয়, তবে তা কেবল মার্কিন-ইরান সম্পর্কের বরফই গলাবে না, বরং সামগ্রিকভাবে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।
Nice
উত্তরমুছুন