লেবানন কি নতুন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে? মার্কিন-ইরান আলোচনার মাঝেই ইসরায়েলের বিপজ্জনক চাল

লেবানন ইসরায়েল সংকট




লেবানন কি আবারো একটি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে? 

বৈরুতের কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের উপ-গবেষণা পরিচালক ও প্রখ্যাত মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলী এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করেছেন। সুইজারল্যান্ডে চলমান মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই লেবানন সীমান্ত পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাকর অবস্থায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বলা যায় না, বরং লেবানন এখন যেকোনো মুহূর্তে জ্বলে ওঠার মতো একটি 'নতুন স্ফুলিঙ্গের' অপেক্ষায় রয়েছে।

​বাফারিং জোন ও মার্কিন-ইরান আলোচনার প্রভাব

​আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে লেবানন বর্তমানে একটি 'বক্সিং ব্যাগ' বা বাফার জোনে পরিণত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে যে কূটনৈতিক আলোচনা বা নেগোসিয়েশন চলছে, তা ব্যাহত করতে বিভিন্ন পক্ষ লেবানন ফ্রন্টকে ব্যবহার করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই মার্কিন-ইরান আলোচনা নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নন। ফলে, লেবাননে উত্তেজনা বাড়িয়ে এই আলোচনাকে নস্যাৎ করার একটি চেষ্টা ইসরায়েলি তরফ থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের কোনো কট্টরপন্থী গ্রুপও যদি এই আলোচনার অগ্রগতিতে অসন্তুষ্ট হয়, তবে তারাও লেবানন ফ্রন্ট ব্যবহার করে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

​ইসরায়েলের আসল লক্ষ্য ও কৌশল

​লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মূল পরিকল্পনা বা 'এন্ড গেম' নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। যদিও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে তারা হিজবুল্লাহর হুমকি নির্মূল করতে চায়, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে একটি নতুন সিকিউরিটি জোন বা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে।

​এখানেই শেষ নয়, ইসরায়েল এই নিরাপত্তা জোনের ভেতরের প্রতিটি বাড়ি, মসজিদ, চার্চ এবং বেসামরিক অবকাঠামো পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এমনকি তারা এই অঞ্চলের ভূমি মালিকানার নথিপত্র বা ল্যান্ড রেজিস্ট্রি অফিসও ধ্বংস করেছে, যাতে স্থানীয় বাস্তুচ্যুত নাগরিকরা আর কখনো তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে আসতে না পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ইসরায়েলের এই নীতিকে স্পষ্ট 'জাতিগত নিধন' বা টেক্সটবুক এথনিক ক্লিনজিং (Ethnic Cleansing) হিসেবে অভিহিত করেছেন।

​কোণঠাসা লেবানন সরকার ও হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ

​বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে লেবাননের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সরকার সম্পূর্ণ কোণঠাসা বা সাইডলাইন হয়ে পড়েছে। বিগত দেড় দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য বিনিয়োগ করলেও, বর্তমান কূটনৈতিক ট্র্যাকগুলোতে লেবানন সরকারের কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যে আলোচনা চলছে, সেখানেও লেবানন রাষ্ট্রের চেয়ে ইরান ও ইসরায়েলের অবস্থানকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

​তবে এই সংকটে ইরান একটি বড় চাল চেলেছে। ইরান কৌশলগতভাবে ওলটপালট করে দিয়েছে সমীকরণ, যখন তারা আলোচনার টেবিলে 'হরমুজ প্রণালী' (Strait of Hormuz) বন্ধ করার বিষয়টি সামনে এনেছে। এর ফলে ইসরায়েল যদি লেবাননে মাত্রাতিরিক্ত সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক স্বার্থে আঘাত হানতে পারে। এই সমীকরণটি হিজবুল্লাহ এবং ইরানের জন্য একটি বড় দরকষাকষির হাতিয়ার (Bargaining Chip) হিসেবে কাজ করছে।

​সামগ্রিকভাবে, লেবাননের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে সুইজারল্যান্ডের আলোচনার টেবিলে এবং সীমান্তে ইসরায়েলি আগ্রাসনের ওপর। যেকোনো একটি ছোট ভুল বা আক্রমণ এই অঞ্চলকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।




Prothom-aloi.com

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন

Facebook