মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের নতুন চাল ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’: ভোট সুরক্ষা নাকি ভোটার দমনের হাতিয়ার?


আন্তর্জাতিক ডেস্ক: 

যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ভোট দেওয়ার অধিকার। কিন্তু বর্তমানে এই অধিকারের নিয়মকানুনগুলো প্রতিনিয়ত নতুন করে লেখার চেষ্টা চলছে। মার্কিন নির্বাচনকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে ভোট দেওয়ার নিয়ম নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর নেপথ্যে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বহুল বিতর্কিত ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ (Save America Act) বা ‘সেভ অ্যাক্ট’ (SAVE Act)। ট্রাম্পের দাবি, এই আইন মার্কিন নির্বাচনকে সুরক্ষিত করবে। অপরদিকে, সমালোচক ও ডেমোক্র্যাটদের মতে, এটি আসলে ভোটার দমনের একটি নতুন হাতিয়ার।

সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট কী এবং ট্রাম্পের দাবি কী?

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, তার প্রস্তাবিত ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ নিশ্চিত করবে যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত নাগরিকরাই নির্বাচনে vote দিতে পারবেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটির ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ এই দাবির সাথে একমত। ট্রাম্পের মতে, রাজ্য কর্মকর্তাদের পরিবর্তে ফেডারেল সরকারের হাতে নির্বাচনের দায়িত্ব থাকা উচিত এবং পুরো দেশে জাতীয়ভাবে পেপার ব্যালট, সমসাময়িক ভোট (Same Day Voting), এবং ভোটার আইডি সহ নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন ।ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এই আইন পাস হলে ডেমোক্র্যাটরা আর কখনোই নির্বাচনে জিততে পারবে না।

কেন এই আইন নিয়ে এত বিতর্ক?

এই আইনের মূল বিতর্কটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রে অ-নাগরিকদের জন্য নির্বাচনে ভোট দেওয়া বা ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ বেআইনি। ফলে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, যা আগে থেকেই অবৈধ, তা নিয়ে এখন কেন এত তোড়জোড়? সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভোটার নিবন্ধনের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ০.০০৪% অ-নাগরিক ছিলেন। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, রিপাবলিকানরা মূলত তাদের ভোট ব্যাংক নিশ্চিত করতে এবং ভোটারদের ভোটদানে বাধা দিতেই এই বিলটি এনেছে।

সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?

যদি ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ পাস হয়, তবে ভোট দিতে বা পুনরায় ভোটার নিবন্ধন করতে প্রত্যেককে পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন সনদ বা ন্যাচারালাইজেশন সার্টিফিকেটের মতো সরাসরি নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে হবে। এতে সাধারণ ভোটাররা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হবেন:
নিম্ন আয়ের মানুষ: কোটি কোটি নিম্ন আয়ের মার্কিন নাগরিকের কাছে এই মুহূর্তে এই নথিগুলো সহজে উপলব্ধ নেই এবং নতুন করে এগুলো সংগ্রহ করার মতো বাড়তি অর্থও তাদের নেই।
নারী ভোটার: বিবাহিত বা বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া নারীদের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি হবে। কারণ তাদের বর্তমান নাম জন্ম সনদের নামের সাথে মিল না থাকলে ম্যারেজ সার্টিফিকেট বা আইনি কাগজপত্রের দীর্ঘ ট্রেইল দেখাতে হবে।
গ্রামীণ ও সামরিক ভোটার: এই আইনে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে নথি যাচাই করতে হবে, যার ফলে মেইল-ইন (ডাকযোগে) নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী এবং দেশের বাইরে কর্মরত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য এটি চরম ভোগান্তির কারণ হবে।
নিবন্ধন কর্মকর্তাদের জেল: কোনো ক্লারিক্যাল ভুল বা সঠিক কাগজপত্র ছাড়া কাউকে নিবন্ধন করালে স্থানীয় নির্বাচন কর্মীদের ৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। ফলে তারা ঝুঁকি এড়াতে অনেক বৈধ ভোটারকেও ফিরিয়ে দিতে পারেন।

নির্বাচনের ফলাফলে সম্ভাব্য প্রভাব ও সুইং স্টেট

পলিটিকো (Politico)-র একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি মানুষ নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখানোর নিয়মকে সমর্থন করলেও ১৮% এর সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। তবে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই আইন কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ ‘সুইং স্টেট’ (Swing States)-এর মধ্যে অন্তত ৮টিতে রিপাবলিকানদের দিকে ভোটের ফলাফল ঘুরে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নিউ মেক্সিকোতে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের নাগরিকত্ব প্রমাণের কাগজ থাকার সম্ভাবনা রিপাবলিকানদের চেয়ে ১৩% কম, যা পুরো রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফলকে বদলে দিতে পারে।

বিলটির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের তীব্র বিরোধিতার কারণে এই বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। এমনকি এটি পাস হলেও অসংখ্য আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং এই নির্বাচন চক্রে এর কোনো প্রভাব পড়বে না]। তবে ট্রাম্প এই আইনকে তার রাজনৈতিক প্রচারণার প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং এটি পাস না হলে কংগ্রেসের অন্য কোনো বিল অনুমোদন না করারও হুমকি দিয়েছেন।
সমালোচকরা এই আইনকে ১৯৬৫ সালের আগের 'জিম ক্রো' (Jim Crow) যুগের ভোটার দমনের বর্ণবাদী নীতির সাথে তুলনা করছেন। ফলে, এই আইনটি ভোট সুরক্ষার চেয়ে মার্কিন রাজনীতিতে একটি বড় পার্টিসান বা দলীয় অস্ত্র হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।







Prothom-aloi.com

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন

Facebook