অনলাইন ডেস্ক:
লেবাননে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবার দক্ষিণ লেবাননের সবচেয়ে বড় এবং অন্যতম প্রধান জনবহুল শহর 'টায়ার' (Tyre) সম্পূর্ণ খালি করার নজিরবিহীন নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আকস্মিক এই জোরপূর্বক উচ্ছেদের নির্দেশ জারির পর পুরো শহর জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে।
এর মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেই লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর 'নাবাতিয়াহ' (Nabatieh) খালি করার একই ধরনের নির্দেশ দিয়েছিল ইসরায়েল। ফলে লেবাননের সামগ্রিক বাস্তুচ্যুত বা শরণার্থী সংকট এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের আগ্রাসন বৃদ্ধি
নামমাত্র যুদ্ধবিরতি কাগজে-কলমে সই থাকলেও মাঠপর্যায়ে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পরিধি দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) দক্ষিণ লেবাননে তাদের নির্ধারিত ১০ কিলোমিটার গভীর নিরাপত্তা অঞ্চলের বাইরে গিয়েও ব্যাপকভাবে স্থল ও বিমান অভিযান চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা লেবাননের অন্তত ৫৫টি শহর ও গ্রাম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।
টায়ার শহরে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা
আল জাজিরার অন-গ্রাউন্ড সংবাদদাতা ওবায়দা হিতো টায়ার শহর থেকে সরাসরি জানিয়েছেন, ইসরায়েলের এই আকস্মিক উচ্ছেদ হুমকির পর সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে সুপারমার্কেট এবং ফার্মেসিতে ভিড় করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সংগ্রহ করার জন্য মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছে। আতঙ্কের কারণে অনেক দোকানপাট এবং জরুরি সেবা কেন্দ্র মুহূর্তের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা এখন কোথায় যাবেন তা বুঝতে পারছেন না। কারণ এর আগে দেশের অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয় ভেবে এই টায়ার শহরে এসেছিলেন। কিন্তু এখন পুরো শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী রাশিদিয়া শরণার্থী শিবিরকেও (Rashidia refugee camp) এই বিপজ্জনক উচ্ছেদ আদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
লেবাননের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট
এই নজিরবিহীন ও জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশের ফলে লেবাননের শরণার্থী সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতির কিছু ভয়াবহ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
- ১০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত: লেবাননের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১০ লাখেরও (১ মিলিয়ন) বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
- বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা: ইসরায়েল দাবি করছে তারা হিজবুল্লাহর অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, তবে বাস্তবে বেসামরিক ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার এবং চিকিৎসকদের ওপর অনবরত হামলা চালানো হচ্ছে।
- বুর্জ শামালিতে তাণ্ডব: সম্প্রতি বুর্জ শামালি (Burj Shamali) এলাকার একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অনেকেই যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে ভেবে নিজেদের বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন।
শান্তি আলোচনা ও রাজনৈতিক কৌশল
আগামী ২৯ মে পেন্টাগনে ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে সামরিক ও প্রযুক্তিগত বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে এবং জুনের শুরুতে ওয়াশিংটনে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এবং লেবানন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই মাঠপর্যায়ে ইসরায়েল এই হামলা ও উচ্ছেদ অভিযান তীব্র করেছে। লেবাননের সাধারণ মানুষের স্পষ্ট ক্ষোভ যে, ইসরায়েল কখনোই কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সম্মান করে না।