মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ইরানের ওপর দ্বিতীয় রাতের মতো অত্যন্ত তীব্র ও নিখুঁত বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (US Central Command)। এই হামলায় ইরানের অন্তত চারজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে হওয়া চুক্তি বা সমঝোতা বাতিল ঘোষণা করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
কৌশলগত ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে তীব্র আঘাত
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এবারের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' (Strait of Hormuz) সংলগ্ন এলাকাগুলো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের অন্যতম প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবস্থিত বুশেহর (Bushehr) শহরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়াও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী চাবাহার (Chabahar)-এর দুটি ডক এবং একটি সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারকে লক্ষ্য করে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আঘাত হানে। হামলার তীব্রতায় চাবাহারের ইমাম আলী হাসপাতালের ওপর গোলার অংশ বা স্প্লিন্টার এসে পড়ে এবং বেশ কয়েকটি প্রধান বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় পুরো চাবাহার শহর তাৎক্ষণিকভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন বা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে বন্দর আব্বাস, সিরক, জাস এবং আবু মুসা দ্বীপের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলো থেকেও ব্যাপক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পাশাপাশি ইরানশাহর (Iranshahr) শহরের বিমানবন্দর সুবিধাকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে মার্কিন দূরপাল্লার যুদ্ধবিমানগুলো।
১ বার আঘাত করলে ২০ বার পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ (Full-scale war) শুরু করার বিষয়টি এখনো মার্কিন প্রশাসনের টেবিলে রয়েছে।
ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, "আমরা তাদের খুব শক্তভাবে আঘাত করেছি। আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি, তারা আমাদের ওপর একবার আঘাত করলে আমরা তাদের ২০ গুণ বেশি কঠোরভাবে (২০ বার) আঘাত করব। তারা আমাদের ৩টি জাহাজে আঘাত করেছিল, আমরা তার কঠিন প্রতিশোধ নিয়েছি।" তিনি আরও দাবি করেন, সামরিক দিক থেকে ইরান বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং তারা ভেতর থেকে চুক্তি করার জন্য অত্যন্ত মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে ইরান কোনো চুক্তি মেনে চলার মতো বিশ্বস্ত কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প সংশয় প্রকাশ করেন।
কেন এই হঠাৎ উত্তেজনা?
হোয়াইট হাউসের বরাতে জানা গেছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance) অভিযোগ করেছেন যে ইরানই প্রথমে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (Memorandum of Understanding) লঙ্ঘন করেছে। মার্কিন প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছিল যে ইরান যদি প্রোভোকেশন বা হামলা বন্ধ রাখে, তবে ওয়াশিংটন তাদের ওপর থাকা নৌ-অবরোধ শিচল করবে। কিন্তু ইরান সেই চুক্তি মাত্র এক সপ্তাহ বজায় রাখতে পেরেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সর্বশেষ বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতেই ইরানের এই হুমকি ও সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত সফলভাবে এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে।
এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে এক চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে একটি দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।