আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ২৪ জুন ২০২৬)
লেবানন সীমান্তে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা চললেও, ইসরায়েলের নিজস্ব 'যুদ্ধবিরতি নীতি' বা যুদ্ধবিরতির ভিন্ন সংজ্ঞার কারণে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডে চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা এখন চরম চাপের মুখে পড়েছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের নানা দিক উঠে এসেছে।
ইসরায়েলের নিজস্ব ‘যুদ্ধবিরতি নীতি’ কী?
সাধারণভাবে যুদ্ধবিরতি বলতে সব ধরনের সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা বোঝালেও, ইসরায়েল সরকার এই ক্ষেত্রে একটি নিজস্ব ফর্মুলা বা ডকট্রিন তৈরি করেছে। এই নীতি অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ড দখল করে সেটিকে 'নিরাপত্তা অঞ্চল' (Security Zone) হিসেবে ঘোষণা করতে চায়। একই সঙ্গে সেখানে অবস্থান করে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে যেকোনো মুহূর্তে বিমান বা সামরিক হামলা চালানোর স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায় তারা।
ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য যতদিন প্রয়োজন, ততদিন তাদের সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করবে। তবে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই নীতিকে সম্পূর্ণ 'অকার্যকর' এবং 'অগ্রহণযোগ্য' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতি হতে হবে সবার জন্য সমান এবং শর্তহীন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ও লেবানন সংকট
লেবাননে ইসরায়েলের এই আগ্রাসী অবস্থান এবং ক্রমাগত হামলার কারণে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বিলম্বিত হচ্ছে, যা পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দিতে পারে। মূলত, লেবাননে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি 'ডিকনফ্লিকশন সেল' (Deconfliction Cell) বা সংঘাত নিরসন সেল গঠন করেছে, যদিও ইসরায়েল বা হিজবুল্লাহ এর সদস্য নয়।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, বৈরুত (লেবানন সরকার) যদি ইসরায়েলের শর্তগুলো মেনে নেয়, তবে ইসরায়েল ধাপে ধাপে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে রাজি হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান কট্টরপন্থী সরকারের ভেতর এই নিয়েও তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। কট্টরপন্থীদের দাবি, হিজবুল্লাহ এবং লেবানন রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা উচিত নয় এবং পুরো লেবাননকেই লক্ষ্যবস্তু করা উচিত।
হোয়াইট হাউজের অসন্তোষ
ইসরায়েলের এই সর্বোচ্চবাদী (Maximalist) বা চরমপন্থী নীতিতে ওয়াশিংটন স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, "মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ হয়ে শুধু নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।"
যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল উভয়েই লেবাননে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এবং বৈরুতের সাথে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে একমত, তবে সেখানে পৌঁছানোর কৌশল নিয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রশাসনের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনার অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের এই ভবিষ্যৎ, যা শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে তার বিতর্কিত 'যুদ্ধবিরতি নীতি' থেকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে।